‘যদি কেউ পুলিশ হত্যার জন্য জুলাই যোদ্ধাদের নামে মামলা করে, তাহলে রাজাকার হত্যার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নামে আমি মামলা করব’- এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এমন বক্তব্য দিয়েছেন দাবিতে একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচিত দাবিতে গত ৩১ মার্চ সম্ভাব্য প্রথম পোস্টটি করা হয় ‘Bengali Steam’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে। পোস্টটিতে গতকাল সকাল ১০টা ১৬ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৮০০ রিঅ্যাকশন পড়েছে। এছাড়া এতে ৬৬৮টি কমেন্ট এবং ৬৬টি শেয়ার রয়েছে। পরবর্তী সময় সেখান থেকেই বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও পেজের (১, ২, ৩) মাধ্যমে ফটোকার্ডটি ছড়িয়ে পড়েছে।
পোস্টের কমেন্ট পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, আখতার হোসেনের নামে ছড়িয়ে পড়া এমন মন্তব্যে নেটিজেনরা নেগেটিভ কমেন্ট করেছেন। কেউ লিখেছেন, ‘তুই কে, তুই কে, রাজাকার।’ আবার কেউ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের ভাত মনে হয় আপনাদের আর খাওয়া হবে না।’ কেউ আবার বলেছেন, ‘বাপ-দাদা বলে কথা।’
গতকালের পত্রিকার অনুসন্ধান : ভাইরাল ফটোকার্ডে তথ্যসূত্র বা বক্তব্যের প্রেক্ষাপট উল্লেখ না থাকায় বিষয়টি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে দেশীয় কোনো গণমাধ্যমে আলোচিত দাবির পক্ষে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী সময় ভাইরাল ফটোকার্ডে প্রচারিত বক্তব্যটির সত্যতা যাচাই করতে চলমান জাতীয় সংসদ অধিবেশন ও সংশ্লিষ্ট বক্তব্য খতিয়ে দেখা হয়। অনুসন্ধানে ‘পুলিশ হত্যার বিচারের বিষয়ে সংসদে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’ শিরোনামে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘এনটিভি’র ৩০ মার্চের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩০ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি বৈঠকের আলোচনায় রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন প্রশ্ন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ নানা ধরনের হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করেছে, মানুষের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করেছে। সেই বিষয়গুলোতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বিচার বিভাগের কার্যক্রমের বাইরে এসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার ডিপার্টমেন্টাল কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কি না এবং এই মুহূর্তে ‘পুলিশ হত্যা’ নামক একটা ফ্রেম ব্যবহার করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে আগস্টের এই ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তিতে। আমরা সে ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্পষ্টভাবে জানতে চাই- এই যে একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হচ্ছে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে, সে ক্ষেত্রে এটা যে ঘাতক, তারা যে ঘাতক ছিল, তাদের যে একধরনের শাস্তির বিধান হয়ে গেছে, সেই বিষয়ে যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, সেই বিশৃঙ্খলাগুলো দূরীকরণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ আছে কি না, তা আপনার মাধ্যমে জানতে চাই।’
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, এ লক্ষ্যে আগেই ‘জুলাই যোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছে এবং তা সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যেসব বিষয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী বিভিন্ন ফেসবুক পেজসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করছে, এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হবে কি না এবং তারা বিভিন্ন দাবি করছে- আমি সেই বিষয়েও আরেকটা অনুষ্ঠানে আগে আমি বলেছিলাম, তাহলে কি মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার করা হবে ১৯৭১ সালে রাজাকার হত্যার বিরুদ্ধে? যদি এখন কেউ মামলা নিয়ে আসে?’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আরো বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজপথে অভ্যুত্থানকারী-আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যারা হানাদার বাহিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, ম্যাসাকার করেছে, গণহত্যা করেছে; জনতার প্রতিরোধের মুখে কেউ কেউ হয়তো প্রাণ হারিয়েছে, কেউ কেউ আহত হয়েছে। কিন্তু সেটা যুদ্ধের ময়দানে ফয়সালা হয়ে গেছে।’
