ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হবে জাতীয় সংসদ। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের উপরে স্থান দেওয়ার জন্য আমরা শপথবদ্ধ। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এ হোক আমাদের মূলমন্ত্র। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। সূচনা বক্তব্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করেন স্পিকার। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে (১৯৯১ সাল হবে) খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছিল। তারপরও বাধাগ্রস্ত হয়েছে গণতন্ত্র।
সংসদ ভবনের বর্ণনা করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিল। গণতন্ত্রের কবর রচনা করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা রোপণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতেও স্বৈরাশাসকদের আগমন ঘটেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের লড়াকু জনগণ প্রত্যেকটি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আমরণ সংগ্রাম করে গণতন্ত্রের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছে। গণতন্ত্রের পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাঝে মাঝে স্বৈরশাসকের পদধ্বনি আমরা শুনতে পেয়েছি। অবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ এক গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় করেছে। এ সংগ্রামে যারা আত্মহুতি দিয়েছে- শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ প্রত্যেক শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। অবশেষে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ আমরা দেখতে পেয়েছি। আমার ১০টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এবারের নির্বাচনকে সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন বলে মনে করি। এখন জনগণ অধীর আগ্রহে রয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদের কার্যক্রম দেখার জন্য। তিনি বলেন, গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ব্যবস্থা। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ে জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করি। বিরোধী দল যাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে সে জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকব। এরই মধ্যে নিরপেক্ষতার খাতিরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে নির্বাচিত হন ভোলা-৩ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন নেত্রকোনা-১-এর সংসদ সদস্য কায়সার কামাল। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিএনপির জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়। পরে তাদের শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
শুরুতে স্পিকার পদে একটিমাত্র মনোনয়ন পেয়েছেন বলে জানান সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন। পরে স্পিকার পদে হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম প্রস্তাব করেন জাতীয় সংসদের হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। একে সমর্থন জানান হুইপ রাকিবুল ইসলাম বকুল। পরে তা ভোটে দেন সভাপতি। যা সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে পাস হয়।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভোলা-৩ আসন থেকে সাতবারের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রীর দায়িত্ব পান বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
পরে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন কার্যক্রম শুরু করেন সভার সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি জানান ডেপুটি স্পিকার পদে একটি মাত্র মনোনয়ন পেয়েছেন। পরে কায়সার কামালের নাম প্রস্তাব করেন হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। তাতে সমর্থন করেন হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন। পরে তা ভোটে দেন সভাপতি। যা সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে পাস হয়।
কায়সার কামাল নেত্রকোনা-১ আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পরে সংসদের অধিবেশনের কিছুক্ষণের জন্য বিরতি ঘোষণা করেন সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিরতিকালে সংসদ ভবনে অবস্থিত রাষ্ট্রপতি কক্ষে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিরতি শেষে পৌনে একটার দিকে নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অধিবেশন আবারও শুরু হয়। কিন্তু সংসদের মাইকে বিভ্রাট থাকায় কিছুক্ষণ পরিচালনা করার পরে বিশ মিনিটের জন্য সভার বিরতি দেন স্পিকার।
