যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। গত শনিবার সকালে তার প্রাসাদ ল করে হামলা চালায় ইসরায়েলি ও মার্কিন সেনারা। তারপর রাতের দিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রথমে খামেনি নিহত হয়েছেন বলে জানান।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও খামেনিকে হত্যার দাবি করেন। সরকারিভাবে ইরান প্রথমে খামেনির নিহতের তথ্য স্বীকার করেনি। পরে গতকাল রবিবার সকালে খামেনির নিহত হওয়ার তথ্য স্বীকার করেছে তেহরান। সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইআরআইবির প্রতিবেদনে বলেছে, আমাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা শহীদ হয়েছেন। ইরানকে সমুন্নত রাখতে এ মহান পণ্ডিত এবং যোদ্ধা তার জীবন উৎসর্গ করেছেন। খামেনি নিহতের ঘটনায় ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করেছে ইরান। এদিকে গতকাল রবিবারও ইরানে দফায় দফায় পেণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একের পর এক হামলা করছে ইরানও।
একের পর এক পেণাস্ত্র হামলা-পাল্টা হামলায় কেঁপে উঠছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ। শনিবার ২০০ মার্কিন বিমান একযোগে ইরানের ৫০০ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বাজিয়ে দেয় যুদ্ধের দামামা। ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালাস্টিক পেণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা আলোচনার মধ্যে এ হামলা চালানো হলো। জবাবে ইরানও ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পেণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে আরো লেখেন, ইরানের জনগণের জন্য নিজেদের দেশকে পুনরুদ্ধারের এটিই একমাত্র শ্রেষ্ঠ সুযোগ।
এর আগে এক ইসরাইলি কর্মকর্তার বরাতে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি সামনে আনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীও দাবি করেন, খামেনি মারা গেছেন এবং তার লাশ চিহ্নিত করা গেছে। স্যাটেলাইটের ছবিতে ধরা পড়ে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযান, অপারেশন রোয়ারিং লায়ন ও অপারেশন এপিক ফিউরির আঘাতে তিগ্রস্ত খামেনির কার্যালয়ের অবস্থা। যদিও শনিবারের অভিযানের সময় খামেনি সেখানে ছিলেন না বলেই জানায় ইরানের গণমাধ্যম। এরপর থেকেই খামেনির জীবিত থাকা, না থাকা নিয়ে শুরু হয় গুঞ্জন।
শোকে ভাসছে ইরান : শুধু খামেনিই নয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় শামখানি ও পাকপুরের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। এছাড়া বিপ্লবী গার্ডের অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার সৈয়দ মজিদ মুসাভি এবং গোয়েন্দা উপমন্ত্রী মোহাম্মদ শিরাজিসহ প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা ওই যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন।
দেশটির বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে তার মেয়ে, জামাতা, নাতি এবং এক পুত্রবধূ রয়েছেন। পরে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভির মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। ইরান এ ঘটনায় ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হামলার আদেশদাতারা শিগগিরই তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা করবে। খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ দ্রুত নতুন নেতা নির্বাচন করবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগীয় প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেমকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের কাউন্সিল খামেনির দায়িত্ব পালন করবে। তেহরান প্রদেশের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির বরাতে ইরানের রাষ্ট্র পরিচালিত ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি আইআরএনএ জানিয়েছে, তেহরানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬০টি হামলা হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ৫৭ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা রাজধানী তেহরান ল করে হামলা চালিয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে।
নেতানিয়াহুকে নিহত খামেনির ছবি দেখানো হয়েছে : ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মারা গেছেন এবং তার লাশ পাওয়া গেছে বলে জানান এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২ জানায়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে খামেনির লাশের ছবি দেখানো হয়েছে। তিনি তার প্রাসাদের কমাউন্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। সেখান থেকে তার লাশ উদ্ধার করেছে ইরানি উদ্ধারকারীরা। শনিবার সকালের দিকে খামেনির প্রাসাদ ল করে বড় হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস পরবর্তীতে স্যাটেলাইটের একটি ছবি প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, খামেনির প্রাসাদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সেটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ইরান সব শক্তি দিয়ে খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেবে -পেজেশকিয়ান : ইরান সব শক্তি দিয়ে খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেবে বলে জানান দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বৈধ অধিকার ও দায়িত্ব।’ গতকাল দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এ অপরাধের পরিকল্পনাকারী, যারা অপরাধের নির্দেশ দিয়েছে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়া ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কর্তব্য। অপরাধীদের ওপর হামলাকে ইরান তার কর্তব্য এবং বৈধ অধিকার বলে মনে করে। তাদের ওপর হামলার দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা পূরণে ইরান তার সব শক্তি নিবেদন করবে। আমাদের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ও উচ্চপদস্থ কমান্ডারদের হত্যার প্রতিশোধ নেব।’
