ঢাকাবুধবার , ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
  • অন্যান্য

৭২ বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি

জয়পত্র ডেস্কঃ
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৪ ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রফিক, শফিক, বরকত, সালামরা। ইতিহাস বলছে সেই ভাষাশহীদদের স্মরণে রাজশাহীতেই নির্মিত হয় দেশের প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। পাকিস্তানি জান্তার চাপ উপেক্ষা করে রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলে ইট-সুরকি ও কাদামাটি দিয়ে রাতের আঁধারে তৈরি হয় শহীদ মিনারটি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, দেশের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি আজও।
যদিও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ভাষাশহীদদের স্মরণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারটি নতুনভাবে নির্মাণের। এমনকি ২০১৮ সালের অক্টোবরে ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যেই রাজশাহী কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা স্মারকটির পুনর্নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু পাইলিংয়েই আটকে আছে ইতিহাসের গুরুত্বর্পূণ অধ্যায়!
জানা যায়, নির্মিতব্য শহীদ মিনারটির নকশায় তিনটি পিলারের মধ্যে বড়টির উচ্চতা রাখা হয় ৫৫ ফুট। এটি হবে সিলভার রঙের। মধ্যম ও ছোট পিলারের উচ্চতা হবে যথাক্রমে ৪০ ও ৩০ ফুট। মধ্যম ও ছোট পিলার দুটি পোড়ামাটির রঙে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া শহীদ মিনারের বেদিতে এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ থাকবে বলে জানানো হয়। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের অধীনে বাস্তবায়নাধীন শহীদ মিনারটির প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৫০ লাখ টাকা। বছর তিনেক আগে পাইলিংয়ের কাজ হলেও আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। অজ্ঞাত কারণে শ্রদ্ধা স্মারক নির্মাণ কার্যক্রম থেমে আছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে ৫২’র ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন সাঈদ উদ্দিন আহমদ। ২০১৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ৮৪ বছর বয়সে মারা যান এই ভাষাসৈনিক। ২০১৫ সালের ১৯ জুলাই ৭৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভাষাসৈনিক আবদুর রাজ্জাক। আরেক ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন ৮৭ বছরে বয়সে ২০২১ সালের ৩১ মার্চ মারা যান।
আরো একজন ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী। বয়সের ভারে বেশিরভাগ সময়ই অসুস্থ থাকেন। জীবনের শেষ সময়ে প্রথম শহীদ মিনারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনঃনির্মিতব্য প্রথম শহীদ মিনার দেখতে পারবেন কি না সংশয় তারও।
এ বিষয়ে জানতে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক ওলিউর রহমান বাবু বলেন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের গেটের পাশেই কলেজের ভাষাসৈনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। এটাই দেশের প্রথম শহীদ মিনার। কারণ সেই সময় ঢাকায় কোনো শহীদ মিনার তৈরি করার পরিবেশ ছিল না। এছাড়াও দেশের কোথাও এ ধরনের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা শহীদ মিনার তৈরি হয়নি।
তিনি দাবি করেন, ২১ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় যখন ঢাকার ঘটনার খবরটি রাজশাহী এসে পৌঁছায়, তখন এই হোস্টেলেরই একটি রুমে তৎকালীন ছাত্রনেতারা বসে সিদ্ধান্ত নিলেন শহীদদের স্মরণে একটা কিছু করা উচিত। সেই সিদ্ধান্তেই সারা রাত ধরে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি এখানে তৈরি করা হয়েছিল। আশপাশের মানুষ তাদের সহযোগিতা দিয়েছিলেন। এটাই সেই প্রথম শহীদ মিনার। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে এর স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কেন যে এটার স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি সেটা আমাদের বোধগম্য নয়।
তিনি আরো বলেন, রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের পাশেই যে প্রথম শহীদ মিনার সেটিকে কেন্দ্র করেই দাবি উঠে রাজশাহীতে একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার তৈরি করা হোক। সেই দাবির প্রতি ভাষাসৈনিকসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠনসহ সাধারণ মানুষ সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি শহীদ মিনার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অজ্ঞাত কারণে সেই নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। ভাষাসৈনিকের ভাই হিসেবে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। শহীদ মিনার নিয়েও কোথায় যেন একটা কারসাজি। এরপর আরেকটি জায়গায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। সেই কাজটাও সেভাবে এগোচ্ছে না। কেন এগুলো হচ্ছে সেই প্রশ্ন থেকে গেল।
এ বিষয়ে কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের যে ইতিহাস আমরা দেখি সেখানে জাতীয়ভাবে একটি বিষয়কে অনেকটা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলা যায়। সেটি হচ্ছে এই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রথম শহীদ মিনারটি গড়ে উঠেছিল রাজশাহী কলেজ মুসলিম ছাত্রবাস প্রাঙ্গণে।
রাজশাহী কলেজ শিক্ষার্থী সুমাইয়া আনোয়ার পূর্ণা বলেন, রাজশাহী কলেজের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এবং রাজশাহীবাসী হিসেবে আসলে এটা অনেক বেশি গর্বের যে, রাজশাহী কলেজে ভাষা আন্দোলনের জন্য ভাষাশহীদদের উদ্দেশে প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়। স্বাধীনতার ৭০ বছর পরও এই প্রথম শহীদ মিনার স্বীকৃতি পায়নি। রাজশাহীবাসী হিসেবে এবং রাজশাহী কলেজের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এটা সবারই প্রাণের দাবি।
রাজশাহী কলেজের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতি মিনার যাই বলি না কেন এটিই ছিল শহীদদের প্রতি প্রথম শ্রদ্ধার প্রতীক বলে মন্তব্য করেছেন রাজশাহীর ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী। কথা বলেছেন প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে।
ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ঢাকার পরবর্তীতে বাংলা ভাষার আন্দোলন রাজশাহীতেই প্রবলতর ছিল। ঢাকায় গোলাগুলির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা রাজশাহী শহরের সব মেস এবং ছাত্ররা যেখানে থাকে সেখানে খবর দিয়ে রাজশাহী কলেজেই সবাইকে নিয়ে বসা হলো।
সেখানে আলোচনা সভায় নেতারা বক্তব্য দেন এবং বর্বরোচিত গুলি চালানোকে অত্যন্ত পৈশাচিক ও নিন্দনীয় বলে আখ্যায়িত করেন। সেই সঙ্গে শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য একটা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক গোলাম আরিফ টিপু (যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর), এস এম আবদুল গাফফার, মনতাজ উদ্দিন, অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামাণিক, অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক, ইঞ্জিনিয়ার নাজমুল, মহির উদ্দিনের সঙ্গে আমিসহ আরো অনেকে আশপাশের ইটপাটকেলের টুকরা জোগাড় করে কাদার গাঁথুনি দিয়ে রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত একটা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তুলি। স্বাধীনতার ৭২ বছরেও এই স্মৃতিস্তম্ভ হয়নি এটি দুঃখজনক।
সেই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে ‘উদয়ের পথে শোন কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’ লেখা ছিল। তারপর সারা রাত স্মৃতিস্তম্ভটি পাহারা দিয়ে রাখি। সকালে আমরা যখন বাড়ি ফিরে যাই, শুনতে পাই মুসলিম লীগের গুণ্ডা ও পুলিশ বাহিনী সেই স্মৃতিস্তম্ভটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাই অবিলম্বে রাজশাহী কলেজের স্মৃতিস্তম্ভকে দেশের প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ ঘোষণার দাবি জানান ভাষাসৈনিক।
রাজশাহী কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর আবদুল খালেক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আমরা গর্বের সঙ্গে বলি, এই ভাষা আন্দোলনের যে শহীদ মিনারটি হয়েছিল প্রথমে সেটি কিন্তু রাজশাহী কলেজেই হয়েছিল। রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের যে মিছিলগুলো হতো সেগুলো রাজশাহী কলেজের ফুলার ভবনের সামনে জমায়েত হয়ে সেখান থেকে শুরু হতো। আর ভাষা আন্দোলনের প্রথম যে শহীদ মিনার রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের গেটের পাশেই হয়েছিল। সেখানে এখন সাধারণ একটা স্থাপনা আছে। সেখানে ভালো মানের একটি শহীদ মিনার করার জন্য ২০১৮ সালে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল। পরে সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার মাধ্যমে প্রকল্পটির উদ্বোধনও করা হয়েছিল। আমরা সেই শহীদ মিনারের থ্রিডি নকশাও দেখেছিলাম। জায়গা নির্ধারণের পর সেখানে লেআউটও দেওয়া হয়েছিল। যতটুকু শুনেছিলাম এর ফান্ডিং সিটি করপোরেশন ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে কিন্তু উদ্বোধনের পর ওই কাজটি আর এগোয়নি।
আমরা প্রতি বছরই খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করি, আশ্বাস পাই যেকোনো সময় বরাদ্দ পাওয়া যাবে, কাজটি শুরুও হবে। যেহেতু উদ্বোধন করা আছে, ভিত্তিপ্রস্তর দেওয়া আছে, এটি হবে। মেয়র ও সংসদ সদস্য মিলে উদ্যোগটি সফল করবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি।