দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২২ আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন আজ। আর আগামীকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শপথ নেবে নতুন মন্ত্রিসভা। আগের চারবারের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাই দায়িত্ব নেবেন বলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে মন্ত্রিসভায় কারা কারা স্থান পাচ্ছেন তা নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। তবে ধারণা করা হচ্ছে পুরোনো অনেকের থাকার পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারে আরো নতুন মুখ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গভবনে শপথ পড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। এজন্য রাষ্ট্রপতির দপ্তর ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যৌথভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে অতিথিদের কাছে আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে। স্পিকার, সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, সরকার ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী নেতারা, সাংবাদিক নেতারাসহ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এদিকে সরকারি যানবাহন পরিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভিআইপি গাড়ি প্রস্তুত রাখতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গতকাল চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের একান্ত সচিব কাজী শাহজাহান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শপথ নেবে নতুন মন্ত্রিসভা। তবে আকার কেমন হবে। কারা থাকছেন আমরা এখনো জানি না।
সরকারের একাধিক ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, নতুন পুরোনো মিলেই গঠন হবে নতুন মন্ত্রিসভা। তবে বর্তমান মন্ত্রিসভার ‘ক্লিন ইমেজধারী’ ও অভিজ্ঞ সদস্যরা নতুন মন্ত্রিসভায় বেশি স্থান পেতে পারেন। আর নতুন করে যুক্ত হবেন দলের সিনিয়র ও ত্যাগী নেতারা।
’৭৫ পরবর্তী সময়ে এটি পঞ্চমবারের মতো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা হতে যাচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে চমক দেখিয়ে আসছেন। তিনি ২০০৯ সাল থেকে মন্ত্রিসভায় দল এবং সরকার আলাদা করার নীতি গ্রহণ করেন। এই ধারায় ২০১৮ মন্ত্রিসভায় তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতার মধ্যে মাত্র চারজনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং ডা. দীপু মনি। এবার মন্ত্রিসভার ধরন কী রকম হবে? মন্ত্রিসভা এবং দল কী আলাদা হবে এটি নিয়ে এখনো চলছে নানা আলাপ-আলোচনা।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভা কী রকম হবে, কারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন এটি চূড়ান্ত করবেন শেখ হাসিনা একাই। এ ব্যাপারে তিনি তার ছোটবোন শেখ রেহানার পরামর্শ নিচ্ছেন। অন্য কেউই মন্ত্রিসভা গঠনের ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন না। তবে এবারের মন্ত্রিসভায় রাজনৈতিক মুখ বেশি থাকবে নাকি আওয়ামী লীগ তার পুরোনো নীতিতে থাকবে অর্থাৎ সরকার এবং দল আলাদা থাকবে সেই প্রশ্নটি দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, বর্তমান মন্ত্রিসভার ‘ক্লিন ইমেজধারী’ ও অভিজ্ঞ সদস্যরা নতুন মন্ত্রিসভায় আবারও স্থান পেতে পারেন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শ ম রেজাউল করিম নতুন মন্ত্রিসভায় আবারও স্থান পেতে পারেন।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম নতুন মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন।
নতুন করে যুক্ত হতে পারেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের মতো প্রেসিডিয়াম সদস্যরা। সিনিয়রদের মধ্যে নাম শোনা যাচ্ছে আ স ম ফিরোজ, আবদুর রহমান। নতুনদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং ড. সেলিম মাহমুদ। নাম শোনা যাচ্ছে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, জামালপুর-৫ (সদর) আসনের এমপি ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, সাইদ খোকন এবং নড়াইল-২ আসনের এমপি ও ক্রিকেট তারকা মাশরাফি বিন মর্তুজাকেও মন্ত্রী বানাতে পারেন শেখ হাসিনা। তবে কোনো কোনো আওয়ামী লীগের নেতা মনে করছেন সরকার এবং দলকে আলাদা করার যে কৌশল নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা, এবারও সেই কৌশলই অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাজপথের আন্দোলন এবং বৈশ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন মন্ত্রিসভায় রাজনৈতিক নেতাদের রাখার সম্ভাবনা ব্যাপক। আগামী বৃহস্পতিবারই বুঝা যাবে মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন তারা থাকছেন না।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, মন্ত্রিসভা গঠনের এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। সংসদ সদস্যদের শপথ হওয়ার পর সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করতে হবে। সেটি অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচিত হবেন। তিনি নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে জানাতে হয় সরকার গঠনের জন্য। এরপর তিনি যখন অনুমোদন দেন তখন সরকার গঠন করা হয়।
একাদশ জাতীয় সংসদে ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রিসভার আকার হয় ৪৭ জনের। এর মধ্যে নতুন মুখ ছিলেন ৩১ জন। পাশাপাশি ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত মন্ত্রিসভায় ছিলেন এমন অনেকেও ওই মন্ত্রিসভায় স্থান পান।
