প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি বাবার মতো জীবনের মায়া ত্যাগ ক?রে সোনার বাংলা গড়েতে কাজ করছি। আমার কাছে ক্ষমতা মানে জনগণের সেবা করা। আর স্বাধীনতাবিরোধী ও খুনিদের মদদ দেয় বিএনপি। দলটি আবার আন্দোলনের নামে অগ্নিসন্ত্রাস ও মানুষ হত্যায় মেতেছে। শনিবার (৪ নভেম্বর) বিকালে মতিঝিলের আরামবাগে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। এর আগে দুপুরে প্রধানমন্ত্রী আগারগাঁও-মতিঝিল মেট্রোরেলের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে মেট্রোরেলে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রাজধানীর আরামবাগের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ঢাকার মানুষের জন্য আজ আমরা নিয়ে এসেছি মেট্রোরেল। মেট্রোরেলটি ঢাকাবাসীর জন্য উপহার। যারা উত্তরায় বসবাস করেন তারা মাত্র ৪০ মিনিটেই প্রতিদিন উত্তরা থেকে মেট্রোরেলে করে মতিঝিল আসা যাওয়া করতে পারবেন। যানজটে কষ্ট পেতে হবে না, রাস্তায় আটকে থাকতে হবে না। যারা চাকরিজীবী, যারা কর্মজীবী, ছাত্র-শিক্ষক সবাই, বিশেষ করে আমার মেয়েরা নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এ মেট্রোরেলে।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কারণে আমি বারবার জীবন ফিরে পেয়েছি। আমিও বাবার মতো এই বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছি। যে আদর্শ নিয়ে এই দেশ গড়ে তুলেছিলেন, সেই বাংলাদেশ আমি গড়তে চাই। সোনার বাংলাদেশ আমি গড়তে চাই।
এর আগে এমআরটি লাইন-৫ অর্থাৎ হেমায়েতপুর থেকে ঢাকার ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই রুটের বিস্তৃতি হবে ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা, ভায়া গাবতলী, মিরপুর-১০, গুলশান পর্যন্ত।
এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের জন্য এরই মধ্যে সাভারের হেমায়েতপুরে ডিপোর মাটি ও ভূমি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই প্রকল্পের পরিচালক আফতাব হোসেন খান। জাপানের টিএও করপোরেশন ও বাংলাদেশের স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগের এ প্রকল্পের ডিপোর জন্য এখন ৯৯ দশমিক ২৫ একর জমির উন্নয়ন কাজ শুরু হবে।
এদিকে আরামবাগের জনসভায় যোগ দিতে সকাল থেকে দলে দলে জড়ো হন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সমা?বেশ রূপ নেয় জনসমু?দ্রে। কাকরাইল থে?কে মতিঝিল, আরামবাগ থে?কে কমলাপুর লো?কে লোকারণ্য ছিল। নানা ধর?নের প্লাকার্ড, ব?্যানার ফেস্টুন নি?য়ে মিছিল করে নেতাকর্মীরা সমা?বে?শে আ?সেন। এ মিছিলে গুরুত্ব পায় আগামী ?নির্বাচন।
জনসভায় ‘মেট্রোরেল হইয়া আমার সময় বাঁচাইছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হইয়া আমার সময় বাঁচাইছে, পদ্মা সেতু হইয়া আমার সময় বাঁচাইছে।’ ‘আরে লাল লাল নীল নীল বাতি দেইখ্যা নয়ন জুড়াইছে, ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে’ গানের সঙ্গে মিলিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি মেয়র আতিকুল ইসলাম নতুন গান শোনান।
জনসভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধনের দিন ২৮ অক্টোবর ঢাকার মানুষ বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করেছিল। তারা আমাদের অশান্তিতে রাখতে চায়, সেজন্য ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। তাদের মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ এগিয়ে যাবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ২৮ অক্টোবর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে বিএনপি। সেদিন বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধন করা হয়েছিল। জনগণ বিএনপির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আজকে মেট্রোরেলের উদ্বোধনে জয়জয়কার। এই আনন্দের মহাযাত্রায় আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করবে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, অগ্নিসন্ত্রাস ও পলিশের ওপর হামলা করে বিএনপি প্রমাণ করেছে তারা সন্ত্রাসী দল। তাদের প্রতিরোধ করে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখা হবে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, বিএনপি ২৮ অক্টোবর পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে। আওয়ামী লীগ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফীর সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য সাঈদ খোকন, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। যৌথভাবে জনসভা সঞ্চালনা করেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি, দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পনিরুজ্জামান তরুণ প্রমুখ।
নিজেকে উৎসর্গ করেছি মানুষের কল্যাণে: মেট্রোরেলে চড়ে রাজধানীর আগারগাঁও থেকে মাত্র ২৫ মিনিটে মতিঝিলে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার (৪ নভেম্বর) দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২টা ২৯ মিনিটে টিকিট সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর তিনি সবুজ পতাকা উড়িয়ে আগারগাঁও-মতিঝিল মেট্রোরেলের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে মেট্রোরেলে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মেট্রোরেলে ভ্রমণকালে গণমাধ্যমকর্মী ও সফরসঙ্গীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে দ্রুত যাতায়াত করতে পারে, ট্রাফিক জ্যাম থেকে মুক্তি পায়, কর্মঘণ্টা বাঁচে সে উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা যোগাযোগব্যবস্থা উন্নতি করার চেষ্টা করেছি। আজ (শবিবার) আমরা উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু করেছি। মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত এক্সটেনশন চালু করব। আমি ধন্যবাদ জানাই জাপান সরকারকে; বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীকে; পাশাপাশি এ মেট্রোরেল নির্মাণকাজে যত শ্রমিক ও আরো যারা কাজ করেছে, তাদের আজ ধন্যবাদ জানাই। আমি শুভেচ্ছা জানাই এ কারণে যে, অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে করোনাকালীনও তারা কাজ করে দ্রুত এটি সম্পন্ন করেছে।
দেশের মানুষের কাছে কোনো প্রত্যাশা আছে কিনা- জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের প্রতি আকাঙ্ক্ষা থাকবে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তারা যেন আত্মমর্যাদা নিয়ে চলেন। যারা অগ্নিসন্ত্রাসী তাদের প্রত্যাখ্যান করবেন। সেটাই চাই। আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি, সৌহার্দ্যে বিশ্বাস করি। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়, এটা নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সেভাবেই এগিয়ে যেতে চাই। এসব দুর্বৃত্তপরায়ণ যারা, পুলিশকে পিটিয়ে মারে, মানুষ মারে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে এদের যেন মানুষ প্রত্যাখ্যান করেন। এদের বিরুদ্ধে যেন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এটাই আমার দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান। আমার বাবা বাঙালি জাতির একটা উন্নত-সমৃদ্ধ জীবন দেবেন বলেই এদেশকে স্বাধীন করেছেন। আমার একটাই প্রত্যয়, আমি বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। আমার আমিত্ব বলে কিছু নেই, আমি নিজেকে উৎসর্গ করেছি এদেশের মানুষের কল্যাণে। মানুষ যখন শান্তি পাবে, তখন আমার বাবাও শান্তি পাবে, তিনি খুশি হবেন, তিনি নিশ্চয় সেটা দেখছেন।
কর্তৃপক্ষ জানায়, রবিবার (৫ নভেম্বর) থেকে পুরো মেট্রোরেল সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। প্রথমে তিনটি স্টেশন চালুর মাধ্যমে এ অংশের মেট্রোরেল চলাচল শুরু হবে। স্টেশনগুলো হলো- মতিঝিল, বাংলাদেশ সচিবালয় এবং ফার্মগেট। কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, ৫ নভেম্বর থেকে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলাচল করা ট্রেনগুলো উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে মতিঝিল পর্যন্ত উভয় দিকে চলাচল করবে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে পরবর্তী ট্রেনগুলো শুধু উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলাচল করবে। এ সময় মতিঝিল পর্যন্ত কোনো ট্রেন আর চলাচল করবে না।
ডিপো থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের ২১.২৬ কিলোমিটার রেলপথে মোট স্টেশন থাকছে ১৭টি। স্টেশনগুলো হচ্ছে- উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর ১১, মিরপুর ১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, মতিঝিল ও কমলাপুর। বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ গত বছরের ডিসেম্বরে চালু হয়। ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ২১.২৬ কিলোমিটার এলিভেটেড মেট্রো লাইন নির্মাণের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার।
