ঢাকাবুধবার , ২১ মে ২০২৫
  • অন্যান্য

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যুগে বাংলাদেশ

জয়পত্র ডেস্কঃ
মে ২১, ২০২৫ ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে নিজেদের এক্স হ্যান্ডলে এক পোস্টে বিষয়টি জানিয়েছে মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠানটি। স্টারলিংকের আনুষ্ঠানিক যাত্রার কথা নিশ্চিত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। বিষয়টি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে যাত্রা শুরুর মাধ্যমে ইলন মাস্কের স্টারলিংক দক্ষিণ এশিয়ার নতুন বাজারে প্রবেশ করল। একইসঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করল স্টারলিংক। জানা গেছে, শুরুতে স্টারলিংক দুটি প্যাকেজ দিয়ে শুরু করেছে। প্যাকেজ দুটি হচ্ছে, স্টারলিংক রেসিডেন্স এবং রেসিডেন্স লাইট। প্রথমটির মাসিক খরচ ৬ হাজার টাকা, দ্বিতীয়টির খরচ পড়বে ৪ হাজার ২০০ টাকা। এছাড়া সেটআপ যন্ত্রপাতির জন্য এককালীন খরচ হবে ৪২ হাজার টাকা। স্টারলিংকের ট্যারিফ বিটিআরসি অনুমোদন দিয়েছে।
তথ্যমতে, স্টারলিংকের ইন্টারনেটে কোনো স্পিড ও ডাটা লিমিট নেই। ৩০০ এমবিপিএস পর্যন্ত গতির আনলিমিটেড ডাটা ব্যবহার করা যাবে। এখন থেকেই অর্ডার করতে পারবেন বাংলাদেশের গ্রাহকরা। এর মধ্য দিয়ে ৯০ দিনের মধ্যেই দেশে স্টারলিংকের কার্যক্রম চালু নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ পেল।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ বলেন, বাংলাদেশে স্টারলিংক অফিসিয়ালি যাত্রা শুরু করল। কিছুটা খরুচে হলেও স্টারলিংকের মাধ্যমে প্রিমিয়াম গ্রাহকদের জন্য উচ্চমান এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা প্রাপ্তির টেকসই বিকল্প তৈরি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যেসব এলাকায় এখনো ফাইবার কিংবা দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছেনি, সেখানে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ পাব। ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তারা সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেটের নিশ্চয়তা পাবেন এখন থেকে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সুযোগ নেই : বাংলাদেশে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা চালু হলেও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানান প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ আশ্বাস দেন।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, স্টারলিংককে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি স্থানীয় গেটওয়ে স্থাপন করতে হবে। এ গেটওয়ের মাধ্যমে তাদের ইন্টারনেট সেবা পরিচালিত হবে, যা সরকারের নজরদারিতে থাকবে। বাণিজ্যিক ও গ্রাউন্ড টেস্টের জন্য স্টারলিংককে ৯০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে, যার ১০ দিন এরই মধ্যে অতিক্রান্ত। এ সময়ের মধ্যে লোকাল গেটওয়ে স্থাপন এবং আইনানুগ ইন্টারসেপশন (এলআইসি) সুবিধা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। তিনি আরো জানান, স্টারলিংকের ডিভাইস আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও ভ্যাট প্রযোজ্য হবে এবং প্রতিটি ডিভাইসের জন্য ছাড়পত্র (এনওসি) গ্রহণ করতে হবে। এটি অননুমোদিত ডিভাইসের প্রবেশ রোধ করবে এবং রাজস্ব আদায়ে সহায়ক হবে। প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমাতে ব্যাচভিত্তিক এনওসির সুযোগও রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সঙ্গে স্টারলিংকের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে, যা নিরাপত্তা আরো জোরদার করবে।
স্টারলিংকের দামকে যৌক্তিক বলছে সরকার : আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশে স্টারলিংকের দাম কম এবং যে দাম ধরা হয়েছে, সেটাকে যৌক্তিক বলছে সরকার। তবে প্রতিবেশী অন্যান্য দেশেও যখন চালু হবে এবং সেখানকার দাম বিবেচনায় সরকারের তা পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে স্টারলিংকের দাম পর্যালোচনা দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্টারলিংকের দাম সবচেয়ে কম। শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডের চেয়েও কম। স্টারলিংকের প্রস্তাব ৭ হাজার টাকার বেশি ছিল। ফয়েজ আহমদ জানান, স্টারলিংকের সেটআপ যন্ত্রপাতির জন্য এককালীন খরচ হবে ৪৭ হাজার টাকা। এছাড়া মাসে স্টারলিংক রেসিডেন্সের খরচ ৬ হাজার এবং এবং রেসিডেন্স লাইটের খরচ ৪ হাজার ২০০ টাকা। এরপর দাম আর সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে না। বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, একটা ডিভাইস থেকে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ মিটার পর্যন্ত ইন্টারনেট পাওয়া যাবে। গ্রামে এটা ৫০ থেকে ৬০ মিটার পর্যন্ত হবে। এক ব্যক্তি কিনে বা একাধিক ব্যক্তি সমিতি আকারে কিনে সেটা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবেন। সরকারের কাছে স্টারলিংক কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রচারণা চালাচ্ছে কেন, স্টারলিংক চালু নিয়ে সরকার কি অস্বাভাবিকভাবে তড়িঘড়ি করছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ফয়েজ আহমদ বলেন, কোনো অস্বাভাবিক তড়িঘড়ি হয়নি। সরকার সব কাজই দ্রুততার করতে চেষ্টা করছে। জুলাইয়ে ইন্টারনেট বন্ধের কারণে বিনিয়োগ ক্ষতি হয়। তখন উচ্চগতি ও মানের একটি টেকসই বিকল্প সরকার খুঁজছিল। সেখান থেকে স্টারলিংক এসেছে। সরকার বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগবান্ধব এবং স্টারলিংক এলে অন্যরাও আসবে। স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার আরো চারটি কোম্পানি আসার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের ইন্টারনেটের মান নিকৃষ্ট, এ মান উন্নয়নেরও দাবি ছিল।
টেলিযোগাযোগ আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার কাজ করছে। বছরের তৃতীয় বা চতুর্থ প্রান্তিকে এ আইনের সংশোধন করে ইন্টারনেট বন্ধ করার বিধানের কালাকানুন বন্ধ করা হবে। এ সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করবে না। তিন বছর ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা করার আগ্রহ দেখাচ্ছে স্টারলিংক। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে স্টারলিংকের প্রযুক্তি এনে পরীক্ষা করা হয়। তৎকালীন মন্ত্রীদের সঙ্গে স্টারলিংকের বৈঠকও হয়েছিল। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, স্টারলিংকের সেবার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় এবং ফল ইতিবাচক ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের বাজারে স্টারলিংকের প্রবেশের ক্ষেত্র আরো ত্বরান্বিত হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে স্টারলিংকের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করে।
ইলন মাস্কের সঙ্গে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ভিডিও কলে স্টারলিংক প্রসঙ্গে আলোচনা করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির একটি দল বাংলাদেশে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন। বিডা গত ২৯ মার্চ স্টারলিংককে বিনিয়োগের নিবন্ধন দেয়। এর এক মাস পর ২৯ এপ্রিল বিটিআরসি ১০ বছরের জন্য তাদের লাইসেন্স দেয়।