রহমত,বরকত,মাগফিরাত ও নাজাতের অবারিত পেয়ালা হাতে নিয়ে আবারও আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে মহিমান্বিত রমজান। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) থেকে শুরু হতে পারে এ বছরের প্রথম রোজা। অফুরন্ত বরকতের এই মাসে মুমিন-মুসলমান সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও প্রবৃত্তি সংযমের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির অনুশীলনে আত্মনিয়োগ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন- ‘মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকির সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কিন্তু রোজা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।’ (বুখারি ১৯০৪, মুসলিম ১১৫১, মুসনাদে আহমদ ৯৭১৪)।
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রমজানের আগমনের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। তারা ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন- যেন তিনি তাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। আবার রমজান শেষে পরবর্তী ছয় মাস দোয়া করতেন- যেন আল্লাহ তাদের রোজা ও ইবাদত কবুল করেন। ফলে তাদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে রমজানের ছোঁয়া লেগে থাকত। (আসরারুল মুহিব্বিন ফি রামাজান : ৪২)।
অতএব, একজন সচেতন মুমিনের জন্য রমজানের অবিরাম কল্যাণ লাভে এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা অপরিহার্য। কারণ, কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের উত্তম প্রস্তুতিই সেই কাজের অর্ধেক সফলতা। তাই রমজান আসার আগে এখন থেকেই নিতে হবে যেসব প্রস্তুতি, তা তুলে ধরা হলো-
দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ : রমজান শুরুর আগেই অন্তরে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করতে হবে- এই রমজান হবে জীবনের মোড় ঘোরানো এক অধ্যায়। আজীবন যত গোনাহ ও ভুল হয়েছে, এ মাসেই আল্লাহর পূর্ণ ক্ষমা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে এবং সর্বোচ্চ সাওয়াব হাসিল করতে হবে। প্রতিটি মুমিনের জন্য এমন প্রতিজ্ঞা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
তওবা ও ইসতেগফারে অভ্যস্ত হওয়া : রমজানের আগে বছরজুড়ে সংঘটিত সব ভুল-ত্রুটির জন্য আন্তরিক তওবাহ ও ইসতেগফার করা আবশ্যক। কেউ যেন এ ধারণা না করে যে, ‘রমজান এলেই সব গুনাহ আপনাতেই মাফ হয়ে যাবে’। বাস্তবে তা নয়। বরং আগেভাগেই তওবাহ করে নিজেকে প্রস্তুত করলে রমজানের কল্যাণ পূর্ণভাবে লাভ করা যায়। এ জন্য বেশি বেশি পড়তে হবে- ‘আল্লাহুম্মাগফিরলি।’ অর্থ: হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন।
কাজা রোজা আদায় করে নেওয়া : পূর্ববর্তী রমজানের কোনো রোজা কাজা হয়ে থাকলে চলতি রমজান শুরুর আগেই তা আদায় করা উত্তম। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে ভাঙতি রোজা থাকার সম্ভাবনা বেশি। তাই শাবান মাসেই এসব কাজা রোজা পূর্ণ করে নেওয়া শ্রেয়।
রমজানের ফজিলত ও উপকারিতা জানা : রমজান সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত ফজিলত, মর্যাদা ও উপকারিতাগুলো আগে থেকেই জেনে নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি এসব কল্যাণ লাভের জন্য কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী চলার মানসিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করতে হবে। এ সময় বেশি বেশি এ দোয়া পড়া- ‘আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’
সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন : রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তবে এ সাধারণ ক্ষমা সবার জন্য নয়। এ জন্য দুটি মারাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে হবে- ১. শিরক থেকে মুক্ত থাকা : ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত, ছোট বা বড়- সব ধরনের শিরক থেকে তওবাহ করে ফিরে আসা। ২. হিংসা পরিহার করা : হিংসা মানুষের নেক আমল এমনভাবে ধ্বংস করে দেয়, যেমন আগুন কাঠ পুড়িয়ে দেয়। তাই ক্ষমা পেতে হলে অন্তরকে এসব অপবিত্রতা থেকে পরিষ্কার করা জরুরি।
ফরজ রোজার মাসআলা-মাসায়েল জানা : রমজান শুরুর আগে রোজা-সংক্রান্ত ফরজ, ওয়াজিব, মাকরুহ ও ভঙ্গের কারণগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া দরকার। এতে রোজা পালনে ভুল হওয়ার আশঙ্কা কমে যায় এবং ইবাদত হয় বিশুদ্ধ।
শাবান মাসে রমজানের মহড়া দেওয়া : শাবান মাসজুড়ে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা, কুরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ, তাওবাহ-ইসতেগফার, দান-সদকা ও ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করা উচিত। এতে রমজানে ইবাদতের গতি ও গভীরতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
পূর্ববর্তী রমজানের ঘাটতি চিহ্নিত করা : আগের রমজানে যেসব নেক আমল নিয়মিত করা সম্ভব হয়নি- তার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। যেমন- নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত না হওয়া। তারাবিহ আদায় না করা। দান-সহযোগিতা না করা। ইতেকাফ না করা। রোজাদার ইফতার করাতে না পারা। এসব ঘাটতি চিহ্নিত করে আসন্ন রমজানে তা পূরণে আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে হবে।
রমজানের ২৪ ঘণ্টার সম্ভাব্য রুটিন তৈরি করা : রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে ব্যয় হবে- তার একটি বাস্তবসম্মত রুটিন আগে থেকেই করে নেওয়া উপকারী। এতে ব্যস্ততার মাঝেও ইবাদত ও দুনিয়াবি কাজ- সবই ইবাদতে পরিণত করা সম্ভব হয়।
রমজানের চাঁদ অনুসন্ধানে সুন্নত জীবিত করা : শাবান মাসের ২৯ তারিখ সন্ধ্যায় রমজানের চাঁদ অনুসন্ধান করা সুন্নত। বর্তমানে অনেকেই শুধু ঘোষণা শোনার অপেক্ষায় থাকেন, ফলে চাঁদ দেখা ও সংশ্লিষ্ট দোয়ার সুন্নত থেকে বঞ্চিত হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে চাঁদ দেখতেন এবং সাহাবিদেরও দেখতে বলতেন। নতুন চাঁদ দেখলে তিনি এ দোয়া পড়তেন- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমানি ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি ওয়াত্তাওফিকি লিমা তুহিব্বু ওয়া তারদা, রাব্বুনা ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।’ অর্থ: আল্লাহ মহান। হে আল্লাহ! এ নতুন চাঁদকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ইমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদয় করো। আর যা তুমি ভালোবাসো ও যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও- সেই কাজের তাওফিক দাও। আমাদের ও তোমার রব একমাত্র আল্লাহ। (তিরমিজি : ৩৪৫১, মিশকাত : ২৪২৮)।
