স্বজন-সহকর্মীদের অশ্রুজল, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় শেষ বিদায় নিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সবুজবাগের বরদেশ্বরী কালীমন্দির-সংলগ্ন শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এর আগে বিকেলে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় সিদ্ধেশ্বরী এলাকার বাসায়। সেখানে পরিবারের সদস্যসহ সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আজকের পত্রিকার এ জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদকের বৃহস্পতিবার সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর সন্ধান মিলছিল না। পরদিন বিকেলে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার কলাগাছিয়া এলাকার চর বলাকীতে তাঁর ভাসমান মৃতদেহ পাওয়া যায়। আজ সকালে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়।
ময়নাতদন্ত শেষে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. শেখ মো. এহসানুল ইসলাম বলেন, মরদেহের বাইরে ও ভেতরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তারপরও দাঁত, চুল, লিভার, কিডনি ও পাকস্থলির কিছু অংশ নিয়েছি। এগুলো ফ্রিজিং করে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মত দিতে পারব।
বিকেলে সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় নেওয়া হয় বিভুরঞ্জনের মরদেহ। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তারা মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মেধাবী মানুষটির এমন পরিণতি কেউ মানতে পারছিলেন না।
বিভুরঞ্জনের পারিবারিক বন্ধু ব্যাংক কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান মুকুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাঁর লেখা পড়ে মুগ্ধ হতাম। তাঁর মতো মেধাবী সাংবাদিক যেভাবে মারা গেলেন, তাতে আমাদের সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে ভাবা উচিত।’
পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর বরদেশ্বরী কালীমন্দির-সংলগ্ন শ্মশানে। সেখানে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
তাঁর ভাই লেখক চিররঞ্জন সরকার সমকালকে বলেন, কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো, মামলা করা হবে কিনা এসব বিষয়ে এখনও আমরা ভাবার সুযোগ পাইনি। পরে সবাই আলোচনা করে এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
রমনা থানার ওসি গোলাম ফারুক বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তিনি বাসা থেকে বের হয়ে মৌচাক মার্কেটের দিকে হেঁটে যান। পরে তাঁকে মগবাজার এলাকায় মাথা নিচু করে বিমর্ষ অবস্থায় হাঁটতে দেখা গেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও (ডিবি) বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তদন্ত শেষ হলে ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানা যাবে। তাঁর শেষ লেখায় এ বিষয়ে কিছুটা ইঙ্গিত রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের কলাগাছিয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা বিভুরঞ্জনের মরদেহ উদ্ধার করেন। ওই ফাঁড়ির পরিদর্শক মোহাম্মদ সালেহ আহমেদ পাঠান বলেন, এ ঘটনায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা হবে। পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে সেই অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পত্রিকাসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কলাম লিখতেন বিভুরঞ্জন সরকার। শুক্রবার বিকেলে ‘খোলা চিঠি’ শিরোনামে তাঁর শেষ লেখাটি প্রকাশ করে বিডিনিউজ। সেখানে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করা ছেলের চাকরি না পাওয়া, চিকিৎসক মেয়ের উচ্চতর পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া নিয়ে হতাশা-মনোকষ্ট প্রকাশ করেছেন। সেই সঙ্গে নিজের ও ছেলের অসুস্থতা, চিকিৎসাব্যয় সামলাতে হিমশিম অবস্থা, আর্থিক দৈন্য, পেশাগত হতাশার কথাও লিখেছেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে সাংবাদিক মহলে।
