ঢাকারবিবার , ২৪ আগস্ট ২০২৫
  • অন্যান্য

জামায়াতবিরোধী ইসলামী দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বিএনপি

জয়পত্র ডেস্কঃ
আগস্ট ২৪, ২০২৫ ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে হোক- এমন স্লোগান নিয়ে ইসলামী দলগুলোকে এক পতাকাতলে আনতে কাজ হচ্ছে বলে জানা গেছে। ভোটের এ জোট হতে পারে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে। এক বাক্সে ভোট স্লোগান নিয়ে চলা দলগুলোর নেতৃত্বে থাকছে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন। কিন্তু জামায়াত বাদে বাকি দলগুলোর সবাই কওমিপন্থি। স্বাভাবিকভাবে দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের আকিদাগত পার্থক্য বেশ পুরোনো।
মওদূদীবাদী এ আকিদাকে কওমি ঘরানার দলগুলো সহ্য করতে পারে না। জামায়াতে ইসলামী ও কওমি ধারার আলেম-ওলামার মধ্যে এ বিরোধ বহু দিনের। ৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কওমিপন্থি বড় পাচটি দল এরই মধ্যে এক জোট হয়েছে। ভোটের মাঠে এ ইসলামপন্থি জোটকে হিসেবে নিয়েছেন বিএনপির নেতারা। তাই তারা জামায়াতবিরোধী ইসলামী দল ও ইসলামী ব্যক্তিত্বের যোগাযোগ করছেন। ইসলাম ধর্মের আকিদাগত পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি জামায়াতকে মোকাবিলার জন্য এরই মধ্যে মঠে মেনেছে। তাই জামায়াতবিরোধীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও সমঝোতা বাড়াচ্ছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।
জানা গেছে, জামায়াতবিরোধী কয়েকটি ইসলামী দল বিএনপির সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতাও করতে রাজি নয়। জামায়াতবিরোধী এ রাজনীতির আরো এক ধাপ অগ্রগতি হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জামায়াতের আকিদা নিয়ে মুখ খুলেছেন। এতেই দেশের বড় বড় পীর ও আলেম-ওলামার মাঝে জামায়াতবিরোধী মনোভাব ধীরে ধীরে আরো সস্পষ্ট হতে শুরু করেছে। দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৮টি নিবন্ধিত ইসলামপন্থি দল জামায়াতের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় যেতে রাজি হয়নি। তবে জমিয়তে ইসলাম ও নেজামে ইসলামী ছাড়া এখনো কেউ বিএনপির সঙ্গেও সমঝোতার কথা বলেনি। তবে বিএনপি নেতারা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত ইসলামপন্থি দলের অধিকাংশই বিএনপির সঙ্গে জোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হিসাব-নিকাশ করেই ভোটের মাঠে নামছে বিএনপি। এজন্য তাদের নজর ইসলামী দল ও ধর্মভিত্তিক সংগঠন এবং দেশের বড় বড় আলেমের সমর্থনের ওপর। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বাইরে যেসব ইসলামী দল ও ধর্মভিত্তিক সংগঠন রয়েছে, সেগুলোর সমর্থন আদায়ে নানা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বিএনপি।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, আমারা সবসময় ইসলামী শক্তির ঐক্য চাই। তবে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের বিষয়ে এখনো আমাদের দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত নেই। দেশের শীর্ষ আলেমদের তত্ত্বাবধানে আমরা সংগঠন পরিচালনা করি, তাদের মতামতের বাইরে গিয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। জামায়াতের ব্যপারে অনেকেরই আপত্তি আছে। বড় আলেমরা যে সিদ্ধান্ত দেন, আমরা সেটিকে আমলে নিতে চাই। এ প্রসঙ্গে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফিন্দী বলেন, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা থেকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বা সমঝোতার কোনো সম্ভাবনাই আমি দেখি না। এখন পর্যন্ত দল আগামী নির্বাচন সামনে রেখে কোনো জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে দলটির নেতারা জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্য সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জোট করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে পিআরসহ কয়েকটি ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বিএনপির। অন্যদিকে জামায়াতও চাইছে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের। জামায়াতের এমন উদ্যোগের পাল্টা হিসেবে বিএনপিও উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামী দল ও সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ার। এরই মধ্যে বিএনপি নেতারা খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম, মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদাররেছীন ও ছারছীনা পীরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিএনপির সঙ্গে এসব দল ও সংগঠনের নেতাদের বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এসব সংগঠনেরও রয়েছে নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ক, যা আগামী নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে। আবার এ সংগঠনগুলোর অনেকেই আদর্শিকভাবেও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির ঘোরতর বিরোধী। আর এ সুযোগটিই কাজে লাগাতে চায় বিএনপি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, ইসলামপন্থি সব মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। হাটহাজারী মাদরাসায় গিয়েছিলাম হেফাজতে ইসলামের আমীরের সঙ্গে দেখা করেছি, কথা বলেছি। ছারছীনা পীরের সঙ্গে দেখা করেছি; আলিয়া মাদরাসাধারার যেসব মুরুব্বি আছেন, তাদের সঙ্গে দেখা করেছি, কথা বলেছি। উদ্দেশ্য একটাই বাংলাদেশের সব জনগোষ্ঠীকে আমরা একত্রিত করে, ঐক্যবদ্ধ করে এমনভাবে দেশ পরিচালনা করতে চাই, যেখানে কোনো বিভক্তি থাকবে না। সবাইকে একত্রে ধারণ করে, বাংলাদেশের গণমুখী চেতনাকে ধারণ করে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সব মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। যাতে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্য সমুন্নত করা যায়, দৃঢ় করা যায়। বিভক্তি নয়, আমরা চাই ঐক্য।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের আমির প্রবীণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ। উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম মাদরাসায় অরাজনৈতিক এ বৃহৎ ইসলামী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমীরের সঙ্গে এ সাক্ষাৎ হয়। এ সময় বিএনপির দুই নীতিনির্ধারক দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের তরফ থেকে হেফাজতের আমীরকে সালাম পৌঁছে দেন এবং দোয়াও চান। হেফাজতের আমীরের স্বাস্থ্যগত অবস্থার খোঁজখবর নেন বিএনপির দুই নেতা।
এছাড়া হাটহাজারীতে পৌঁছেই সেখানে হেফাজতে ইসলামের মরহুম আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করেন। এর আগে ২৯ জুলাই রাজধানীর বনানীতে ছারছীনা দরবার শরিফে গিয়ে পীর মুফতি শাহ আবু নছর নেছারউদ্দীন আহমাদ হুসাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি ছারছীনা দরবার শরিফের পীরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং একান্তে কথা বলেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সালাম ছারছীনা দরবার শরিফের পীরের কাছে পৌঁছে দেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে গাউসুল আজম কমপ্লেক্সে মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদাররেছীনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম ও সালাহউদ্দিন আহমেদ।