ঢাকাবুধবার , ৩০ অক্টোবর ২০২৪
  • অন্যান্য

দিনভর ব্যস্ত জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু সরকারের

জয়পত্র ডেস্কঃ
অক্টোবর ৩০, ২০২৪ ৫:৩৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

অবশেষে নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু করেছে ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ নিয়ে সচিবালয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড.আসিফ নজরুল বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠনসংক্রান্ত সার্চ কমিটি গঠন হয়ে গেছে। প্রজ্ঞাপনে হয়তো প্রধান উপদেষ্টা স্বাক্ষরও করেছেন। আজ-কালের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারি হবে। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু হয়ে গেছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
জুলাই গণহত্যা,মানবাধিকার,নির্বাচন,ঢাকায় মানবাধিকার কার্যালয় খোলাসহ বেশকিছু এজেন্ডা নিয়ে দুইদিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। প্রথম দিন মঙ্গলবার সকাল থেকে ব্যস্ত সময় পার করেন তিনি। এদিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতি, সেনাবাহিনী প্রধান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান তুর্ক।
সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে ছিলেন ভলকার তুর্ক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই ঢাকা সফরের কথা ছিল তুর্কের। তবে উভয় পক্ষের সময়সূচিতে সমন্বয় না হওয়ায় পিছিয়ে মঙ্গলবার সকালে দুদিনের সফরে ঢাকায় আসেন তুর্ক। এদিন ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে ভলকার তুর্ককে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক হাসান। হাইকমিশনার তার মিশন শেষে আজ বিকাল সাড়ে ৫টায় ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে।
সকালে সচিবালয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সার্চ কমিটির প্রজ্ঞাপন আজ-কালের মধ্যে জারি করা হবে। নির্বাচন নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে কি না জানতে চাইলে আসিফ নজরুল বলেন, নির্বাচন নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তবে আপনাদের আমি একটা কথা বলতে পারি, আমাদের সরকারের নির্বাচনমুখী প্রক্রিয়া গ্রহণ করার যে কাজ, সেটা শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু হয়ে গেছে, আপনারা বলতে পারেন। তিনি বলেন, আমি যতদূর জানি, সার্চ কমিটির সেই প্রজ্ঞাপনটি আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বাক্ষর করে দিলেই আপনারা জানতে পারবেন। হয়তো তিনি করেছেনও, আজ-কালের মধ্যে জেনে যাবেন।
আসিফ নজরুল বলেন, সার্চ কমিটি হয়ে গেলে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলে ভোটার তালিকা ঠিক করা হবে। আগেও বলেছি, ভোটার তালিকা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন ছিল, গত নির্বাচন এমন ভুয়া ছিল, ভোটার তালিকা নিয়ে মানুষের মাথাব্যথা ছিল না।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার আছে কি না-এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, গণহত্যা চালানোর পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার থাকা উচিত কি না, তা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিবেচনা করবেন। তিনি বলেন, যারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, আরও চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার মানুষের অঙ্গহানি ঘটিয়েছে, চোখ কেড়ে নিয়েছে, এখনো তারা সেই অপকর্মের পক্ষে কথা বলে। তিনি বলেন, যদি ফাঁস হওয়া রেকর্ডটা সঠিক হয়, তাহলে এখনো তাদের নেত্রী (শেখ হাসিনা) ২৮৭ জনকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। অন্য দেশে বসে সন্ত্রাসী হুমকি দিচ্ছে, যিনি একটা গণহত্যার মামলার আসামি। বিচারের আগে, দায়মুক্তির আগে তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাবে আরও হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার জন্য? কাজেই সবকিছু একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসবে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, আপনারা বিবেচনা করে দেখেন, একটা গণহত্যা চালানোর পর এখনো একটা দল বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আমাদের এত বড় আন্দোলনের নেতাদের কিশোর গ্যাং বলার চেষ্টা করে, আরও মানুষকে হত্যা করার হুমকি দেয়, সেই দলের রাজনৈতিক অধিকার থাকা উচিত কি না, তা প্রতিটি মানুষই বিবেচনা করবেন। বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দেখা যাবে, তাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব দেশেই মৃত্যুদণ্ড রহিত করার কথা বলে জাতিসংঘ। তাদের একটি অপশনাল প্রটোকল আছে। ওই প্রটোকলের মূলকথাই হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড রদ করার জন্য। কিন্তু পৃথিবীর খুব অল্প দেশই মৃত্যুদণ্ড রদ করেছে। এটা তাদের অঙ্গীকার থেকে বলবেই। কিন্তু আমাদের যে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম, আমাদের যে জুডিশিয়াল কালচার আছে, সেগুলো তো আমাদের কাছে প্রাধান্য পাবে। সবচেয়ে বড় কথা, মৃত্যুদণ্ড রহিত করার যে অপশনাল প্রটোকল, তাতে বাংলাদেশের কোনো সরকারই পক্ষরাষ্ট্র হয়নি। আমাদের কোনো সরকারের পক্ষ থেকেই এ অপশনাল প্রটোকলের পক্ষরাষ্ট্র হওয়ার বিন্দুমাত্র উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
আসিফ নজরুল বলেন, তাদের (ভলকার তুর্ক) বলেছি, আমাদের আইনগত যে সংস্কার, সেটাতে তারা জড়িত আছেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে আমাদের যদি ফরেনসিক সহায়তা লাগে, সেটা তারা দেবেন। আমরা এখানে সুবিচার করব, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিচার করছি না।
বৈঠকের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, তাদের বলেছি, আমাদের আইনগত যে সংস্কার, সেটাতে তারা জড়িত আছেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে আমাদের যদি ফরেনসিক সহায়তা লাগে, সেটা তারা দেবেন। আমরা এখানে সুবিচার করব, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিচার করছি না। আগের আদালতে যেভাবে হয়েছে, সেভাবে আমরা অবিচার করব না। আমাদের কোনোকিছু লুকানোর নেই। যে কেউ এসে, আমরা কীভাবে বিচার করছি, সেটা দেখতে পারবেন, স্বাগত জানাব।
জুলাই গণহত্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে : জুলাই গণহত্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি এটা নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ভলকার তুর্ক বলেন, আইন উপদেষ্টার সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে কথা বলেছি। বর্তমান সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সেক্ষেত্রে মানবাধিকার যেন নিশ্চিত করা হয়, সেটি বলেছি।
ঢাকায় অফিস খুলবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন : বিকালে ভলকার তুর্কের সঙ্গে আলোচনা শেষে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অফিস খোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় বিষয়টি ইতিবাচক দেখছে সরকার। জুলাই গণহত্যা নিয়ে তদন্ত করছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন। ঢাকায় অফিস খুললে তদন্তে বড় ভূমিকা রাখবে বলেও জানান উপদেষ্টা।
এর আগে ভলকার তুর্কের সঙ্গে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মধ্যাহ্নভোজে মিলিত হন অন্তর্বর্তী সরকারের পাঁচজন উপদেষ্টা। তারা হলেন শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান; সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক ভালো : দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো। এ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনের কোনো কনসার্ন নেই। তারা জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেবেন। আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভেতরে কোনো ভুল বা দুর্নীতি হলে তা প্রকাশ করতে কোনো আপত্তি নেই। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সংস্কার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে জানতে চেয়েছেন। আমরা বলেছি, নিরাপত্তা নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। তিনি বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সৈনিক পাঠায়। আমাদের শান্তিরক্ষীদের নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। তারপরও পাঠানোর আগে একটু যাচাই-বাছাই করে পাঠাতে বলেছেন। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে। বলেছি, আমরা কতদিন রোহিঙ্গাদের বোঝা বহন করব? আমাদের নিজেদের জনবল বেশি, জায়গার সংকট। দু-চারজন করে সবসময় রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে। দিনদিন তাদের সংখ্যা বাড়ছে। আগে ১২ লাখ রোহিঙ্গা ছিল। এখন সেটা অনেক বেড়ে গেছে। রোহিঙ্গারা কবে তাদের দেশে ফিরে যাবে, সেটার যেন ব্যবস্থা করা হয়। এ নিয়ে জোরালো আলোচনা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্বে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন, পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. ময়নুল ইসলাম, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান, ডিএমপি কমিশনার মো. মাইনুল হাসান, জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোস্তফা জামান প্রমুখ।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ভলকার তুর্কের সাক্ষাৎ : এদিন দুপুরে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। সুপ্রিমকোর্টে প্রধান বিচারপতির দপ্তরে ৪০ মিনিটব্যাপী তাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে কোনো পক্ষই কিছু জানায়নি।