রমজানে ইফতারে সাধারণ মানুষের পছন্দ খেজুর ও ছোলা। এ কারণে রমজানে পণ্য দুটির চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণ। এই সুযোগে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে পাল্লা দিয়ে বাড়তে খাকে পণ্য দুটির বাজারদর। রমজান আসার আগেই ছোলার দাম আকাশচুম্বী, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে খেজুরের দাম। বাজার মনিটরিংয়ে কাজ হচ্ছে না। সিন্ডিকেটের হোতারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এরাই বাজারের নিয়ন্ত্রক। তারা যে দাম নির্ধারণ করবেন, সে দামেই বিক্রি হবে। ফলে এ বছর পণ্য দুটি কিনতে গুনতে হবে বাড়তি দাম। তবে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আছে ভোজ্যতেল।
অভিযোগ উঠেছে, নানা অজুহাতে কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী তৈরি করছে কৃত্রিম সংকট। যে দামে আমদানি, তার তিন গুণ দামে বিক্রি হচ্ছে খেজুর। বিপুল পরিমাণে আমদানির পরও ছোলার দাম নাগালের বাইরে। এবার তেল, চিনি নিয়ে তেমন একটা সুবিধা করতে না পারলেও ছোলা ও খেজুরের বাজার অস্থির করে ফায়দা লুটছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু গত ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম এসে সার্কিট হাউসে ডেকে পাঠান খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী নেতাদের। এ সময় তিনি বলেছেন, সরকার নিত্যপণ্য নিয়ে জিম্মি হতে চায় না। আমদানিকারক ও মিল মালিক সরবরাহ লাইনে সমস্যা তৈরি করে বলেও মন্তব্য করেন। পুলিশ ও ভোক্তা অধিদপ্তর দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও জানান। তিনি বলেন, শুল্ক কমালেও ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য সরবরাহ করে না। কোনো মিল পণ্য সরবরাহ বন্ধ করলে তার গেট বন্ধ হবে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা করে চালের দাম বাড়িয়েছিল উল্লেখ করে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেন, টিসিবিতে বাফার স্টক গড়ে তোলার কাজ চলছে। এদিকে, মন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পরের দিন থেকে ছোলা আর খেজুরের বাজার বাড়তে থাকে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি ছোলার দাম ৮৭ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ টাকায়। আর খেজুরের দাম উঠেছে ১২০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকায়। জানা গেছে, এবার রমজান সামনে রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ছয়টি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হয়। এ ছয়টি পণ্য হলো ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা ও খেজুর। রমজানের তিন মাস আগে থেকে শুরু হয় এসব ভোগ্যপণ্য আমদানি। বাজার সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে সরকার চাল, চিনি, তেলসহ কিছু পণ্যের শুল্ক-কর কমিয়ে দেয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে চালের আমদানি শুল্ক-কর ৬৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক কমানো হয় ২০ শতাংশ। পরিশোধিত-অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ, চিনি প্রতি টনে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১৫০০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১০০০ টাকা, খেজুর আমদানিতে শুল্ক ৫৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। কিন্তু দেখা যায় শুল্ক কমানোর কোনো প্রভাব বাজারে পড়েনি।
অনুসন্ধানে জান গেছে, ছোলা এবার আমদানি হয়েছে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৫১৬ টন ছোলা আমদানি হয়েছে। ব্যয় হয়েছে ৩৬৭ কোটি টাকা। সেই হিসেবে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলতি ছোলা আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার টনেরও বেশি। আরো কয়েকটি জাহাজে ছোলা আসছে।
২০২২-২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা প্রতি কেজি ছোলার মূল্য ছিল ৬২ থেকে ৬৫ টাকায়। তখন রোজার শুরুর আগে ছোলার দাম ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এবার একই ছোলার দাম ১১০ টাকা।
সূত্র মতে, রোজা শুরুর আগে টিসিবির কার্যক্রমে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম টানা হয়। সরকারের শক্ত অবস্থানে সিন্ডিকেটের চাপ ভেস্তে যায়। আমদানির একাধিক বড় চালান আসতে থাকায় তেলের বাজার আগের মতো। জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায় ৭ লাখ ৪৭ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি খেজুর নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফআইএ) নেতারা দাবি করেন, ‘কাস্টমস খেজুরের শুল্কায়নের জন্য যে অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নির্ধারণ করেছে, তার কারণেই দাম বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম অনুযায়ী শুল্কায়ন করার জন্য তারা দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ইরাক থেকে কার্টনে ৮০০-৯০০ ডলারে যে খেজুর আমদানি করছি, সেটার অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫০০ ডলারে। প্রায় তিন গুণ বেশি দাম দেখিয়ে যে খেজুরটার শুল্ক নেওয়া হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। কাস্টমস আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ ও আমাদের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত দামের ওপর অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নির্ধারণ করুক, এটাই আমরা চাই। নাহলে খেজুরের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। দামের কারণে মানুষও খেজুর কিনতে পারছে না।’
সূত্র মতে, প্রতি বছর রোজায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা থাকে। এরই মধ্যে জানুয়ারি পর্যন্ত গত তিন মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে। আরো শতাধিক কনটেইনার খেজুর আছে। খালাসের অপেক্ষায় আছে প্রায় ১৫ হাজার টন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালুর কারণে খেজুরগুলো খালাস হচ্ছে না। পাইপলাইনের বাইরে নতুন করে কেউ আমদানিক করছে না। প্রকৃত দামের ওপর অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নির্ধারণ না করার কারণে আমদানিকারকদের অযৌক্তিকভাবে শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সূত্র মতে, গত রোজার আগে মানভেদে প্রতি কেজি খেজুরে যেখানে শুল্ক দিতে হতো ৫.৪৫ টাকা থেকে ২১.৮৪ টাকা, সেটি এবার দাঁড়িয়েছে ৫৪ টাকা থেকে ২০৮ টাকায়। ব্যবসায়ীরা জানান, পাইকারি বাজারে গত বছর রোজায় ৯০-১১০ টাকা দরের খেজুর এবার ১৪০-১৫০ টাকা, ১২০-১৩০ টাকার খেজুর ২৫০ টাকারও বেশি, ২০০ টাকার খেজুর ৪০০ টাকার বেশি এবং ৩০০-৩৫০ টাকার খেজুর ৬০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতি টন খেজুর ৫০০-১৩০০ ডলার দিয়ে কিনে দেশের তার অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ধরা হয় ক্যাটাগরি ভেদে ১০০০-২৭৫০ ডলার। অর্থাৎ প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম ধরে শুল্ক আদায় করছে কাস্টমস। খেজুর কিনে ঝুঁকি নিতে চাইছে না কেউ। বাজারে খেজুরের দামেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
