ঢাকাশুক্রবার , ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩
  • অন্যান্য

অভিযোগের স্তূপ ইসিতে অস্বস্তি

জয়পত্র ডেস্কঃ
ডিসেম্বর ১৫, ২০২৩ ২:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

প্রশাসন ও পুলিশে বড় ধরনের বদলি এবং রদবদলেও অস্বস্তি কাটছে না নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) ব্যাপক হারে বদলি না হওয়ায় ইসির এ অস্বস্তি।
এদিকে দু-একজন পুলিশ কমিশনার, ডিসি, এসপি ও ওসি বদলি হয়েছে, যা নিরপেক্ষ ভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে অপ্রতুল বলেও ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক প্রার্থীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। এ পর্যন্ত যেসব কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে, সবার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। এছাড়া আরো ২০ থেকে ২৫ জন ডিসি ও এসপির বিরুদ্ধে অনিয়মের তদন্ত করছে কমিশন। এর মধ্যে খুলনা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ, বরিশাল বিভাগসহ বেশ কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। অনিয়ম প্রমাণ হলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সাতক্ষীরার এসপির মতো অন্য কর্মকর্তাদের পরিণতি ঘটতে পারে বলে ইসির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তিমূলক বদলি না করার পক্ষে ইসি। অপরাধের ধরন এবং কর্মস্থলে অতীত কর্মকাণ্ড আমলে নিচ্ছে সাংবিধানিক এ সংস্থা।
এছাড়া ৩০০ সংসদীয় আসনের বিপরীতে প্রতিদিন শত শত অভিযোগ আসছে। এসব অভিযোগের মধ্যে বর্তমান এমপি ও মনোনীত প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং এলাকার বিক্ষুব্ধ ব্যক্তির পক্ষ থেকে আসছে এসব অভিযোগ। তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, অভিযোগের স্তূপ জমা হচ্ছে। সব অভিযোগ আমলযোগ্য নয়। তবে আমলযোগ্যগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে কমিশন।
ইসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগ পেলেই কমিশন কাউকে কিংবা প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কমিশন তাদের নিজস্ব সোর্স ব্যবহার করে অভিযোগের সত্যতা পেলেই তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছে বা নেওয়ার পক্ষে। প্রার্থী এবং সংক্ষুব্ধদের পক্ষ থেকে করা অভিযোগ এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনার অভিযোগ দুটির মধ্যে যৌক্তিক কারণ থাকলেই শুধু জেলার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের বদলি করছে ইসি।
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বদলি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত করা হবে- এমন নয়। ভোটের আগের দিন পর্যন্ত চলমান। গুরুতর অভিযোগ পেলেই তাকে বদলি বা প্রত্যাহার করা হবে। এখন পর্যন্ত ৩০০ সংসদীয় আসনের বিপরীতে ২০ থেকে ২৫ জন এসপি ও ডিসির বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে। খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগসহ আরো কয়েকটি বিভাগেও অনুরূপ অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ইসিতে কয়েকটি আসন থেকে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ পাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে বরিশাল-৪ (বর্তমান নৌকার এমপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী পঙ্কজ দেবনাথ এবং নৌকার মনোনয়ন পাওয়া শাম্মী আহমেদ) ফরিদপুর-৪ (স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজিবর রহমান নিক্সন চৌধুরী ও নৌকার মনোনীত প্রার্থী জাফরউল্লাহ চৌধুরী), বরিশাল-৫ (স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ছেলে বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ ও নৌকার প্রার্থী জাহিদ ফারুক) এবং ফরিদপুর-৩ (স্বতন্ত্র প্রার্থী ও হামিম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরী এবং নৌকার মনোনীত প্রার্থী শামিম হক) রয়েছে। এসব আসনে সব হেভিওটে প্রার্থী দলীয় এবং স্বতন্ত্র। আসনগুলো থেকে পক্ষে-বিপক্ষে অভিযোগ আসছে প্রশাসন ও পুলিশের বিরুদ্ধে। প্রশাসন কাউকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করছে বলেও ইসির কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ এবং নালিশ জানিয়ে আসছে। এ নিয়েও অস্বস্তিতে রয়েছেন ইসির নীতিনির্ধারকরা।
গতকাল বৃহস্পতিবারও বেশকিছু আসন থেকে অভিযোগ এসেছে ইসিতে। এমন একটি অভিযোগ করেছেন লালমনিরহাট-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোছা. হালিমা খাতুন। তিনি তার অভিযোগে সরাসরি ডিসি, এসপি, কালীগঞ্জ উপজেলার ইউএনও এবং ওসির বদলি চেয়েছেন। অভিযোগে বলেন, তারা দীর্ঘদিন এখানে অবস্থান করছেন এবং স্থানীয় এমপি ও মন্ত্রীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছেন। এ প্রশাসন দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। অরেকটি অভিযোগ জমা হয়েছে ঝিনাইদহ-১ আসন থেকে। এ আসনের সংক্ষুব্ধ একাধিক ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছেন এতে। ঝিনাইদহের শৈলকূপা থানার ওসিকে বদলি চেয়েছেন। প্রতিদিন এমন অভিযোগ আসছে ইসিতে।
যশোরের এসপি প্রলয় জোয়াদ্দারের বদলি চেয়ে ইসিতে আবেদন করেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) ছয়জন এমপি পদপ্রার্থী। তবে কমিশন অভিযোগ নথিতে তুলে কমিশনের মতামতের জন্য উত্থাপন করলেও নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা অভিযোগটি তদন্তের জন্য মত দিলেও অন্য কমিশনাররা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। কমিশনের এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, যশোর এসপির বিরুদ্ধে ছয়জন প্রার্থী একযোগে অভিযোগ দিলেও তার কোনো ভিত্তি নেই। অভিযোগ হচ্ছে, ওই জেলায় তার শ্বশুরবাড়ি। এটা কোনো অপরাধ হতে পারে না। তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে মেরেছেন কিনা, নারীঘটিত কেলেঙ্কারি আছে কিনা কিংবা কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করছে কিনা- এমন কোনো অভিযোগ তো এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা হয়নি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত চার শতাধিক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। তবে প্রত্যাহার করা হয়েছে একজন ডিসি, দুই পুলিশ কমিশনার, ৫ এসপি এবং ৩ ওসিকে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসিকে গত ১০ ডিসেম্বর প্রত্যাহার করা হয়। এ ডিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থনকারী ভোটারকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর দ্বারা আটকে রাখা। এ ঘটনা ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জানার পরও পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো ওই দলীয় প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন। এতে ওই রিটার্নিং কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তাকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
সাতক্ষীর এসপির বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ আসে ইসিতে। নিরপরাধ ব্যক্তিদের আটকের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, নারী কেলেঙ্কারি এবং মাদকসহ চোরা কারবারির সঙ্গে সখ্য অন্যতম। এসব অভিযোগ এবং ইসির সোর্সের দেওয়া তথ্য অভিন্ন হওয়ায় ওই এসপিকে দায়িত্ব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এছাড়া প্রত্যাহার করা অন্য পুলিশ কমিশনার ও এসপিরা হলেন- বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার, পিরোজপুর পুলিশ সুপার, নোয়াখালী পুলিশ সুপার এবং মেহেরপুর পুলিশ সুপার। আর প্রত্যাহার হওয়া ওসিরা হলেন- মানিকগঞ্জ সদর ও সিংগাইর এবং গাজীপুরের শ্রীপুর।
এদিকে এখন পর্যন্ত বদলি হয়েছেন ৩০০ সংসদীয় আসনের বিপরীতে ২০৫ ইউএনও। যার মধ্যে ময়মনসিংহে ইউএনওদের নিজ জেলার মধ্যে বদলি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাকিগুলো পার্শ্ববর্তী কিংবা দূরের জেলায় পদায়ন করা হয়েছে। এছাড়া কমবেশি ৩৫০ ওসিকে বদলি করা হয়েছে। তবে বদলি হওয়া ওসিদের নতুন কর্মস্থলে পৌঁছার আগেই প্রভাবশালী প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে বলেও ইসির কাছে তথ্য এসেছে। এ নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন নির্বাচন কমিশনাররা। তাদের অভিমত, এ ধরনের বদলিতে শুধু স্টেশন বদল হয়েছে। তাই সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ তৈরি হয়নি। যদি প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা যেত, তাহলেই ইসির প্রত্যাশিত চাওয়া পূরণ হতো।
এছাড়া কুমিল্লা-১ সংসদীয় আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী নাঈম হাসানের প্রার্থিতা বাতিল করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এর বিরুদ্ধে কমিশনে আপিল করেছিলেন এ স্বতন্ত্র প্রার্থী। ইসির অস্থায়ী আদালত রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বহাল রেখে আপিল নামঞ্জুর করেন। এ আসনের নৌকার প্রার্থী সবুরের সমর্থক সারোয়ার হোসেন বাবুল ইসির গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ ছিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ওই নৌকার কর্মীকে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে আক্রমণ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। দায়িত্বরত পুলিশ উভয় পক্ষে মারামারিতের জড়িতদের তাৎক্ষণিক আটক করে রাখে।