গাজীপুরে বিক্ষোভ সংঘর্ষ নারীশ্রমিকের মৃত্যু ছিন্নভিন্ন এক পুলিশের কবজি, ৫ পুলিশসহ আহত ২০
সরকারঘোষিত ন্যূনতম মজুরি প্রত্যাখ্যান করে গাজীপুরে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে এক নারী শ্রমিক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আরেক শ্রমিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এছাড়া শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্যের কবজি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। এসব সংঘর্ষে পাঁচ পুলিশসহ ২০ শ্রমিক আহত হয়েছেন।
গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী, জরুন ও নাওজোড় এলাকায় বুধবার সকালে পোশাক শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। এ ঘটনায় অন্তত ১০ শ্রমিক আহত হন। আহতদের মধ্যে দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে এক নারীশ্রমিককে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এদিকে বিকেলে মহানগরের নাওজোড় এলাকায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে এক পুলিশ সদস্যের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ঘটনায় ৫ পুলিশসহ অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
নিহত ওই নারীশ্রমিকের নাম আঞ্জুয়ারা খাতুন (২২)। আঞ্জুয়ারার নিহতের বিষয়টি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফাঁড়ি পুলিশের ইনচার্জ মো. বাচ্চু মিয়া নিশ্চিত করেছেন। গাজীপুর মেট্টোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) ইব্রাহীম খান ওই নারীশ্রমিক নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনার সময় হুড়োহুড়িতে ওই নারীশ্রমিক পড়ে গিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে গুরুতর আহত হন। জানা গেছে, আঞ্জুয়ারা খাতুনের বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজীপুর থানার চরগিরিশ এলাকায়। তিনি কোনাবাড়ী জরুন এলাকার ইসলাম গার্মেন্টস ইউনিট-২-এর সেলাইমেশিন অপারেটর পদে চাকরি করতেন। আঞ্জুয়ারার ননদ আরজিনা খাতুন জানান, নিহতের স্বামী জামাল হোসেনের বাড়ি একই এলাকায়। তারা কোনাবাড়ীতে ভাড়ায় বসবাস করেন। জামাল হোসেনও কোনাবাড়ীর পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি গার্মেন্টেসে চাকরি করেন। তাদের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে আরিফ (৭) স্থানীয় স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে এবং মেয়ে জয়া দ্বিতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া করে।
পুলিশ, শ্রমিক ও এলাকাবাসী জানান, বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বেশ কিছু দিন ধরে বিক্ষোভ করে আসছিলেন। গত মঙ্গলবার পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এতে শ্রমিকরা সস্তুষ্ট না হয়ে বুধবার সকাল থেকে কোনাবাড়ী, জরুন ও বাইমাইল এলাকায় বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা বিভিন্ন সড়কে কাঠ ও টায়ারে আগুন দেন। এছাড়া বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুরের চেষ্টা কনের। শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এসময় শ্রমিক-পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারসেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে অন্তত ১০ শ্রমিক আহত হন। আহতদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং স্থানীয় ক্লিনিকে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে শুরুতর অবস্থায় আঞ্জুয়ারা খাতুন ও জালাল উদ্দিনকে (৪২) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। জালাল উদ্দিন ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
কোনাবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ আশরাফ উদ্দিন জানান, শ্রমিকরা আঞ্চলিক সড়কগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি ও ভাঙচুরের চেষ্টা করেন। তাদের মহাসড়কে নামতে দেওয়া হয়নি। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারসেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে বিকেলে অন্দোলনরত শ্রমিকরা লাঠিসোটা নিয়ে মহানগরের নাওজোড় এলাকায় জড়ো হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে রাখেন। পুলিশ মহাসড়ক থেকে সরাতে গেলে শ্রমিকরা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ঘটনায় ৫ জন পুলিশসহ অন্তত ১০ আহত হন। আহত পুলিশ সদস্যদের গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম জানান, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ৫ পুলিশ সদস্যকে এ হাসপাতালে আনা হয়। তারা হলেন প্রবীর (৩০), ফুয়াদ (৩৫), খোরশেদ (৩৫), আশিকুর (২৮) ও বিটুল (২৪)। এদের মধ্যে প্রবীর, খোরশেদ, ফুয়াদকে ঢামেকে রেফার্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে ফুয়াদের ডান হাতের কব্জি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। খবর পেয়ে গাজীপুর মেট্টোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুব হোসেন ওই হাসপাতালে আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে যান।
এ প্রসঙ্গে গাজীপুর মেট্টোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) ইব্রাহীম খান বলেন, কোনাবাড়ী থেকে শ্রমিকরা লাঠিসোটা নিয়ে নাওজোড় এলাকায় জড়ো হয়ে মহাসড়কে নামেন। তাদের সরাতে গেলে পুলিশের ওপর প্রচুর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এসময় ৫ পুলিশ সদস্য আহত হন। এ সংবাদ লেখার সময় (৫টা ৪৫ মিনিট) নগরীর তিনসড়ক, চান্দনা চৌরাস্তা ও রওশন সড়ক এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছিল।
