* আড়াইহাজারে তিন পুলিশকে কুপিয়ে জখম * সিলেটে আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল * ঢাকায় ১৮৩ জন কারাগারে
বিএনপি ও জামায়াতের তিন দিন অবরোধের প্রথম দিন মঙ্গলবার (৩১ অক্টোবর) সংঘাত ও প্রাণহানির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এ দিন কিশোরগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন, সিলেটে প্রাণ গেছে একজনের। এই প্রাণহানির প্রতিবাদে স্থানীয় ছাত্রদল সিলেটে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে। নারায়ণগঞ্জে তিন পুলিশকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে ভাঙচুর, সংঘাত-সংঘর্ষ ও বাস পুড়ানোর ঘটনা। ঢাকায় যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল হামলা করেছে জামায়াত ও বিএনপির কর্মীরা। এদিকে সন্ত্রাস ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত থাকায় পুলিশ বিএনপি ও জামায়াতের ১৮৩ জনকে আটক করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।
এ দিন অবরোধ চলাকালে রাজধানী থেকে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, লঞ্চ ছেড়ে গেছে এবং ঢাকার বাইরে থেকে রাজধানীতে প্রবেশ করেছে অনেক বাস ও ট্রেন। বিমান চলাচলও স্বাভাবিক ছিল। সচিবালয়সহ বিভিন্ন অফিস আদালতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। রাজধানীতে গণপরিবহন কম ছিল। বিভিন্ন স্থানে মার্কেট-দোকানপাট খোলা ছিল। অবরোধ আহ্বানকারীদের তৎপরতা দেখা পড়েছে। বিএনপি সকাল থেকে মিরপুর, শাহবাগ, মুগদা ও সূত্রাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল বের করে। তবে রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ছিল কড়া। নগরীর রাস্তাগলোর মোড়ে মোড়ে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি।
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে দুজনের প্রাণহানি ঘটে। বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য, অবরোধের প্রথম দিনে সকাল ৮টার দিকে ছয়সূতি ইউনিয়ন বিএনপির পক্ষ থেকে মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নিয়ে উপজেলার ছয়সূতি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যাওয়ামাত্র আগে থেকে অবস্থান নেওয়া পুলিশ সদস্যরা মিছিল লক্ষ করে গুলি ছোড়ে। এতে কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের দাবি, মিছিলকারীরা লাঠিসোটা নিয়ে আগে পুলিশের ওপর হামলা করে। আত্মরক্ষার জন্য পুলিশ পাশের একটি বাড়িতে অবস্থান নেয়। সেখানে গিয়েও বিএনপির কর্মীরা হামলা চালায়। ওই সময় উভয় পক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সকাল ৮টার দিকে উপজেলার ছয়সূতি বাসস্ট্যান্ডে এই ঘটনায় দুপক্ষের অর্ধশতাধিক আহত হন। কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল মিল্লাত বলেন, তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। পুলিশের গুলিতে রিফাত ও বিল্লাল নামে তাদের দুই নেতা মারা যান। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রিফাত উল্লাহ উপজেলার ছয়সূতি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহসভাপতি। বিল্লাল মিয়া একই ইউনিয়নের কৃষক দলের সভাপতি। ঘটনার পর রিফাতের মরদেহ জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিল্লালের মরদেহ ঘটনাস্থলের কাছেই রাখা হয় বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। ঘটনার পর পুলিশ সুপার মো. রাসেল শেখ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
কুলিয়ারচর থানার ওসি মো. গোলাম মস্তুফা বলেছেন, মিছিলকারীরা প্রথমে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। তাতে ২০ জন আহত হন। তার মতে এ ঘটনায় একজন মারা গেছেন। তবে সেটি গুলিতে, নাকি অন্য কোনো কারণে মারা গেছে তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলম বলেন, অবরোধের সমর্থনে ছয়সূতি ইউনিয়নের আঞ্চলিক সড়কে অবস্থান নেন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পুলিশ বাধা দিলেও সড়কে মিছিল বের করেন তারা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাঁধে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা ইটপাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছে। কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আদনান আক্তার বলেন, ওসিসহ ১৫ থেকে ১৬ জন পুলিশ সদস্য চিকিৎসা নিয়েছেন।
সকালে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চৌদ্দশত ইউনিয়নের ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালায় পিকেটাররা। এ সময় পুলিশকে উদ্দেশ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করেন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা। জানা যায়, এ ঘটনায় কিশোরগঞ্জ মডেল থানার একটি গাড়িতেও হামলা চালায় পিকেটাররা। কিশোরগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ দাউদ বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।
সিলেট প্রতিনিধি জানান, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে সড়কে এক যুবদল কর্মী নিহত হয়েছেন। নিহত যুবদল কর্মীর নাম জিল্লুর রহমান, সে গোলাপগঞ্জের মদনগৌরী এলাকার এলাইছ মিয়ার ছেলে। মঙ্গলবার দুপুরে দক্ষিণ সুরমার রশিদপুরে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের লালাবাজারে অবরোধের সমর্থনে পিকেটিং করে পালানোর সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান জিল্লুর রহমান। দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি শামসুদ্দোহা গণমাধ্যমকে বলেন, পিকেটিং করার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখে দ্রুতগতিতে পালানোর সময় সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। এই নিহতের ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় যুবদল সিলেটে আজ সকাল সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে।
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, অবরোধ চলাকালে পুলিশ-বিজিবি টহল দেওয়ার সময় ধাওয়া করে মোটরসাইকেল আরোহী জিল্লুরকে গাড়ি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এরপর সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতাল তার মৃত্যু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ত্রিমুখী সংঘর্ষে আড়াইহাজারে ৩ পুলিশসহ ২০ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাঁচরুখী বাজার এলাকায় এ সংঘর্ষ হয়।
আহত তিন পুলিশ সদস্য হলেন পরিদর্শক হুমায়ুন কবির, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মতিন ও কনস্টেবল মো. নুরুল। পুলিশ জানায়, কনস্টেবল নুরুলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। পরিদর্শক হুমায়ুন কবিরের ডান হাত কুপিয়ে জখমের পর পিটিয়ে বাঁ হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এএসআই মতিনকে লাঠি ও ইটপাটকেল দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। নুরুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং বাকি দুজনকে রূপগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, আড়াইহাজারের পাঁচরুখী এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বিএনপি নেতাকর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তাদের সেখানে গিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিএনপিকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার সময় তাদের দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে ও ককটেল বিস্ফোরণে তিন পুলিশ সদস্যসহ ছয়জন আহত হয়।
রাজধানীর কদমতলীতে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কদমতলী থানার মুন্সিখোলা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। কদমতলী থানার ওসি প্রলয় কুমার সাহা বলেন, দুর্বৃত্তরা বোরাক নামে একটি পরিবহনের গাড়ি ভাঙচুর করে পরে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বিএনপি-জামায়াতের ডাকা তিন দিনের অবরোধের প্রথম দিনেই রাজধানীর ডেমরার মাতুয়াইল এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে ডেমরা থানার ওসি (তদন্ত)সহ তিন পুলিশ আহত হয়েছেন। এ সময় পুলিশ ২৫ জনকে আটক করেছে।
আমাদের প্রতিনিধি জানান, খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নে ককটেল বিস্ফোরণ ও রাস্তায় টায়ারে আগুন দিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে জামায়াত শিবিরের কর্মীরা। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে দাকোপের কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের হরিনটানা বোর্ডবাড়ী বাজারে রাস্তায় জামায়াত শিবিরের কর্মীরা পরপর ৪-৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সকালে মানিকগঞ্জ শহরের সেওতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। মিছিলটি মনরা এলাকা হয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। তখন বিএনপি কর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়।
ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, ধামরাইয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে একটি স্কুলবাসসহ দুটি বাস ভাঙচুর ও রাস্তার ওপর টায়ার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। দুপুরের দিকে ধামরাই উপজেলার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের শ্রীরামপুর, জয়পুরা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আটক করা হয়েছে মোস্তফাকে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের পরিবহনকারী স্বপ্নচূড়া বাস হামলার শিকার হয় মঙ্গলবার। নারায়ণগঞ্জ থেকে শিক্ষার্থী নিয়ে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে সকাল ৮টায় গেন্ডারিয়ায় বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের হামলার শিকার হয় বাসটি। অবরোধকারীরা বাসে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।
গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। গ্রেপ্তাররা হলো- ছাত্রদলের জবি শাখার সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান হিমেল, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. সাইদুজ্জামান সরকার সাইদী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, হাসিবুল হাসান। রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দুর্বৃত্তরা মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে যাত্রীবাহী একটি বাসে আগুন দিয়েছে খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভান। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, কয়েকজন ব্যক্তি যাত্রী সেজে ওই গাড়িতে উঠেছিলেন। নেমে যাওয়ার সময় তারা বাসটিতে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যান।
